নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে ভয়ঙ্কর ওই পাঁচ খুনের পেছনে ছিল অনৈতিক স¤পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতা। আর সে ব্যর্থতা থেকে সৃষ্টি হওয়া চরম ক্ষোভ। মূলত যৌন আবেদনে ব্যর্থ হয়েই মাহফুজ ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে বসে তার মামীসহ পাঁচজনকে। তাহলে গোবেচারা গোছের মাহফুজ কীভাবে হয়ে ওঠে ঠাণ্ডা মাথার খুনি? কে এই মাহফুজ: মাহফুজের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায়। তার বাবার নাম শরফুল মিয়া। আর মার নাম আছিয়া বেগম। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে মাহফুজ সবার বড়। তার শৈশব কাটে গ্রামেই। এরপর মামা শফিকুল ইসলাম তাকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। রাজধানীর কলাবাগানের ৪৪/১/এ নম্বর বাসায় মামা-মামীর সঙ্গে থাকতে শুরু করে মাহফুজ। কলাবাগানের বশির উদ্দিন রোডের একটি মাদরাসায় তাকে ভর্তি করে দেন মামা-মামী। এরই মধ্যে মাহফুজের বাবা শরফুল মিয়া জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছাড়েন। চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। নগরীর পাইকপাড়া এলাকায় শুরু করেন বসবাস। এসময় ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালান শুরু করেন মাহফুজের বাবা। মাদরাসায় পড়ার সময়েই বদলে যেতে থাকে মাহফুজ। হয়ে পড়ে মামা-মামীর পুরোপুরি অবাধ্য। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই থেকে যায় তার পড়ালেখা। মামাসহ তার পরিবারের সদস্যরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে পড়ালেখা ফেরাতে পারেনি। বাধ্য হয়েই মামা শরিফুল ইসলাম তার ভাগ্নে মাহফুজকে তার মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় মা-বাবার সঙ্গে ছয় বছর কাটানোর পরে মাহফুজ ফের চলে আসে কলাবাগানে মামার বাসায়। এসে সে কাজ নেয় মামা শফিকুলের শ্যালক মোরশেদুল ওরফে মোশারফের হোসিয়ারি কারাখানায়। মাহফুজের আরেক মামার নাম শরিফ (শফিকুলের ছোট ভাই)। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আজ থেকে বছর দুয়েক আগে তিনি বিয়ে করেন। মাহফুজের মামীর নাম লামিয়া। এক পর্যায়ে মাহফুজের কুনজর পড়ে মামীর ওপর। একদিন ফাঁকা ঘরে মামী লামিয়াকে জড়িয়ে ধরে সে। এরপর ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ঘটনাটি জানার পরে মাহফুজকে জুতাপেটা করে কলাবাগানের বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন বড় মামী তাসলিমা। লামিয়া ওই ঘটনাটি তার ভাসুর শফিকুল ইসলামকেও জানিয়েছিলেন। এতে মাহফুজকে বকাঝকা করেন বাসায় যেতে নিষেধ করে দেন বড় মামা শফিকুল। মামীকে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। একপর্যায়ে লামিয়া তার বাবা মাকেও বিষয়টি জানিয়ে দেন। এতে শফিকুল তার ভাগ্নে মাহফুজকে ঢাকায় রেখে সপরিবারের চলে যান নারায়ণগঞ্জের ২ নম্বর বাবুরাইল এলাকায়। সেখানে গিয়ে পারিবারিক শালিস বসে। বৈঠকে মাহফুজের বিচার করা হয়। হিংস্র হয়ে ওঠে মাহফুজ: এতো কিছুর পরেও কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি মাহফুজের মধ্যে। বড় আর মামা-মামী নারায়ণগঞ্জ চলে যাওয়ার পরে সেও সেখানে গিয়ে অবস্থান নেয়। কাজ নেয় কারাখানায়। আবারো চেষ্টা করে মামী লামিয়ার সঙ্গে অনৈতিক স¤পর্ক স্থাপনের। আবারো তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এবারেও লামিয়া তার ভাগ্নের যৌন নিপীড়নের কথা জানিয়ে দেন বাবা-মাকে। আবারো পারিবারিক শালিসে জুতোপেটা করা হয় মাহফুজকে। বের করে দেয়া হয় বাড়ি থেকে। তবে এবার সে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর হিংস্র। সেই কালো রাত: মাহফুজ আগের দিন (১৪ জানুয়ারি) খবর নিয়েছিল তার দুই মামার মধ্যে শফিক ঢাকায় আর শরিফ গেছেন কিশোরগঞ্জে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে ১৫ জানুয়ারি মাগরিব নামাজের সময় মামার ফ্ল্যাটে পৌঁছে যায়। দরজায় কড়া নাড়লে খুলে দেয় মামাতো বোন শান্ত। ঘরে ঢুকেই সে শান্তকে ১০ টাকা দিয়ে বলে, ‘কাউকে বলবি না আমি এসেছি।’ এ কথা বলেই সে মামী লামিয়ার খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে। সে জানতো এ ঘরে ছোট মামী লামিয়া আর মামা শরিফ ঘুমান। কিন্তু মামা শরিফ না থাকায় লামিয়া খাটে একাই ঘুমাবেন। মনের ভেতর কুপ্রবৃত্তি নিয়েই সে মামীর খাটের নিচে কাটিয়ে দেয় ৯ ঘণ্টা। তবে সে রাতে ঘরে লামিয়া না এসে ঘুমাতে আসেন তাসলিমার ভাই মোরশেদুল। কারণ খুন হওয়া পাঁচজনই রাত আড়াইটা পর্যন্ত অপর ঘরে বসে টিভিতে ছবি দেখছিলেন। মাহফুজ যে খাটের নিচে লুকিয়ে আছে তা গভীর রাতে টের পেয়ে যান মোরশেদুল। তিনি ঘটনাটি তার বড় বোন ও মাহফুজের বড় মামী তাসলিমাকে জানান। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয় মাহফুজ। একদিকে নিজের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া আর অন্যদিকে ৯ ঘণ্টা ধরে খাটের নিচে থেকেও ধরা পড়ায় সে ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। তাই সে তাৎক্ষণিকভাবে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর পেশাদার খুনির মতোই নৃশংসভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে একের পর এক খুন করতে থাকে। তাহলে সাধারণ একজন তরুণ কীভাবে হয়ে ওঠে এমন ভয়ঙ্কর খুনি? এ নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকাশ সংস্কৃতির কারণে শিশু-কিশোররা খুব সহজেই হাতের কাছে পেয়ে যায় নগ্ন রগরগে যৌনতাভরা অশ্লীল ভিডিও। তাছাড়া নানা কারণে পর্নোগ্রাফিতেও আসক্ত হয়ে পড়ে তারা। এমন এক পরিস্থিতিতে নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মাহফুজও হয়ে ওঠে অপরাধী। এর ওপর তাকে কুপথ থেকে ফেরানোর জন্য শাস্তি ও অপমানের পথ অবলম্বন করা হয়। এতে সে চরম হিংস্র হয়ে ওঠে। ঘাতক মাহফুজ ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সবার অগোচরে ওই বাসায় প্রবেশ করে একটি খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। রাত ২টার দিকে খাটের নিচ থেকে বের হলে মোশাররফ বিষয়টি টের পান। এ সময় মশলা বাটার শিল (পুতা) দিতে মোশারফের মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ভোরে লামিয়া ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যান। বাথরুম থেকে বের হলে মাহফুজ পুতা দিয়ে একইভাবে মাথায় আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়। মৃতদেহটি মোশাররফের রুমে রেখে দরজা ভেতের থেকে বন্ধ করে রাখেন মাহফুজ। সকালে তাসলিমার ছেলে শান্ত স্কুলে যায়। এরপর তাসলিমাকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়। এই হত্যার ঘটনা দেখে ফেলায় তাসলিমার মেয়ে সুমাইয়াকে হত্যা করা হয়। আর স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পর শান্তকে হত্যা করে ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা দিয়ে পালিয়ে যায় মাহফুজ। জবানবন্দিতে মাহফুজ আরও জানান, ১৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত থেকে ১৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত একে একে ৫ জনকে হত্যা করেন তিনি। উল্লেখ্য, গত ১৫ জানুয়ারি দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুরাইল খানকা মোড় এলাকায় ‘আশেক আলী ভিলা’ নামের একটি বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃংশসভাবে গলা কেটে হত্যা করে মাহফুজ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাড়ির ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন- তাসলিমা আক্তার (৪০) তার ছেলে শান্ত (১০), মেয়ে সুমাইয়া (৫), ভাই মোরশেদুল (২৫) এবং তার জা লামিয়া (২৫)।